Home ›› ইত‌িহাস ›› ভূগোল ›› কালাপানি : ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা এক কুখ্যাত বন্দিশিবির।

কালাপানি : ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা এক কুখ্যাত বন্দিশিবির।

কালাপানি : ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা এক কুখ্যাত বন্দিশিবির।
প্রখর রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে টানা ছয় ঘণ্টা ধরে অমানুষিক পরিশ্রম করে, সুশীল দাশগুপ্তর দু’হাত রঞ্জিত হয়ে উঠেছে নিজের রক্তেই। সমান তালে, অবিরামভাবে নারিকেল ভেঙে তার ছোবড়া থেকে আঁশ বের করার কাজটি করতে করতে ঘেমে নেয়ে উঠেছে তার পুরো শরীর। গলা শুকিয়ে একদম কাঠ হয়ে গেছে। এক মুহূর্তের জন্য কাজ থামিয়ে পাহারাদারকে বলেছিলেন এক গ্লাস পানি দিতে। পানি তো মিললই না, বরং পাহারাদারদের মুহুর্মুহু টিপ্পনীর সাথে শুরু হলো নতুন এক পাশবিক খেলা। হাতে-পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরানো সুশীলকে বলা হলো, হেঁটে গিয়ে পাশের নদী থেকে সবার জন্য পানি আনতে হবে। কাঁটাগাছে ভরা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কিছুদূর হেঁটে যেতেই তার ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত শরীর থেকে নেমে এলো রক্তের ধারা। জ্ঞান হারিয়ে সেখানেই পড়ে রইলেন সুশীল। শেষবারের মতো এক চুমুক পানিও জুটল না তার কপালে।

Advertisement

 

এরকম অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন সুশীলের মতো অসংখ্য রাজনৈতিক বন্দী। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে এমন সম্ভাবনাময় তরুণদের শাস্তি হিসেবে পাঠানো হতো বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত আন্দামান সেলুলার জেলে। সাধারণ মানুষের কাছে জেলখানাটি ‘কালাপানি’ নামেই অধিক পরিচিত। ‘কালা’ বলতে এখানে মৃত্যুকেই বোঝানো হয়, আর বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত হওয়ায় নামের সাথে যুক্ত হয়েছে ‘পানি’।

কালাপানি : ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা এক কুখ্যাত বন্দিশিবির।

সিপাহী বিদ্রোহের সময় আন্দামানের কালাপানি; Source: wikimedia.org

ইংরেজ আমলে ভারতে, বিশেষত বাংলার ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের আটকে রাখার জন্য যে ক’টি কুখ্যাত বন্দিশিবির তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে কালাপানি অন্যতম। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী বটুকেশ্বর দত্ত, উল্লাসকর দত্ত, বিনায়ক দামোদর সাভারকরের মতো বিশিষ্ট প্রতিবাদী ও আন্দোলনকারী ব্যক্তিবর্গকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল কালাপানিতে। কলকাতা ও মাদ্রাজ থেকে যথাক্রমে ১,২৫৫ এবং ১,১৫১ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের বুকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত এই সেলুলার জেলটি।

১৮৫৭ সালে সংঘটিত সিপাহী বিদ্রোহের সময় থেকেই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জকে বন্দীশিবির হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল ব্রিটিশরা। তবে সে সময় আলাদা করে কোনো কারাগার নির্মাণ করা হয়নি। ১৮৮৯ সালের ১২ জুন ভারতবর্ষের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে এ কয়েদখানাসংবলিত উপনিবেশটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অবশেষে ১৮৯৩ সালে সেই উপনিবেশের অংশ হিসেবে সেলুলার জেল নির্মাণের কাজে হাতে দেয়া হয়। মাত্র তিন বছরের মধ্যে, ১৮৯৬ সালে, প্রায় ছয়শ কয়েদির দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয় কালাপানির। এ যেন নিজের হাতে নিজের কবর খুঁড়ে বাকিদেরও সেই কবরে শোয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া। ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম এই আন্দোলনে ব্রিটিশদের সাথে খুব একটা কুলিয়ে উঠতে পারেননি বিদ্রোহীরা। বেশিরভাগ বিদ্রোহীকে দমন করা হয় হত্যার মাধ্যমে, বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডস্বরূপ নির্বাসনে পাঠানো হয় আন্দামানে।

কালাপানি : ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা এক কুখ্যাত বন্দিশিবির।

সেলুলার জেলের একটি উইং; Source: wikimedia.org

Advertisement

 

কারারক্ষী ডেভিড ব্যারি এবং সামরিক চিকিৎসক মেজর জেমস প্যাটিসন ওয়াকারের তত্ত্বাবধায়নে সিপাহী বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী শতাধিক বিদ্রোহীকে পাঠিয়ে দেয়া হয় আন্দামানে। আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে কয়েদীর সংখ্যা, আর এই সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যায় কয়েদীদের মনের ক্ষোভ। জঙ্গল পরিস্কার করা, কাঠ কাটা, পানি আনা- এসব কাজ করতে গিয়ে এখানে-সেখানে তারা দেখতে পায় অসংখ্য মৃতদেহ। এরই মধ্যে কয়েকজন ব্রিটিশ পরিদর্শক এসে জায়গাটিকে মানুষের থাকার অনুপযোগী বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু সেসব কথা কানেই তোলেনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। রাজনৈতিক বন্দীদের গুম করে দেয়ার জন্য এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর কোথায় থাকতে পারে? কয়েদী পালাতে গিয়ে মারা গেছে- এ কথা বলে দিলেই খালাস কারা কর্তৃপক্ষ।

এরই মধ্যে ১৮৬৮ সালের এপ্রিলে ২৩৮ জন কারাবন্দী জেল থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। তাদের মধ্যে ৮৭ জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। বাকিদের অবস্থা আলাদা করে বলার কিছু নেই। একবারে মরার সৌভাগ্য যাদের হয়নি, তিলে তিলে তাদের দুনিয়া ছাড়া বর্বর ব্রিটিশরা। অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কেউ হয়ে যেতেন উন্মাদ, কেউ অকালে হারাতেন প্রাণ। এভাবে দিনকে দিন ঔপনিবেশিক শাসনবাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠানো প্রতিবাদী মানুষগুলোকে ধরে এনে বিচারের নামে প্রহসন চালায় তারা। বেশিরভাগ কয়েদীকে গ্রেপ্তার করা হতো বাংলা এবং বার্মার দিক থেকে।

আন্দামানের তীব্র স্রোত আর কালো পানিকে খুব ভয় পেতেন কয়েদীরা, সাঁতরে এই পথ পাড়ি দেয়া ছিল এককথায় অসম্ভব। নির্জন এই দ্বীপটি থেকে বের হওয়ার আর কোনো রাস্তা নেই। কাজেই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শায়েস্তা করার জন্য কালাপানি হয়ে ওঠে ব্রিটিশদের একদম মনমতো একটি জায়গা। শিকলে বেঁধে তাদেরকে বাধ্য করা হতো কারাগারসহ দ্বীপটিতে নতুন নতুন বাড়ি বানাতে, যেখানে আরাম-আয়েশ করে দিন কাটাত ব্রিটিশ শোষক কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও উপনিবেশবাদ আরও শক্তপোক্ত করতে আন্দামানে জেটি নির্মাণেও বাধ্য করা হতো কয়েদীদের। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে, ভারতের স্বাধীনতা যখন অভ্যুত্থানে রূপ নিচ্ছে, সে সময় গ্রেপ্তারকৃত রাজবন্দীদের জন্য উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা সম্বলিত কারাগারের প্রয়োজনীয়তা অত্যাবশ্যক হয়ে ওঠে।

কালাপানি : ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা এক কুখ্যাত বন্দিশিবির।

কালাপানি এখন স্মৃতিসৌধ; Source: ytimg.com

ব্রিটিশ রাজের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োজিত স্যার চার্লস জেমস এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের সার্জন এ. এস. ল্যাথব্রিজ পরামর্শ দেন, আন্দামানের সেলুলার জেলে দ্বীপান্তরিত হয়ে আসা কয়েদীদের জন্য একটি ন্যূনতম মেয়াদে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মাঠেঘাটে এভাবে সবাই মরে পড়ে থাকলে তা ভারতবাসীর আরও বেশি চোখে পড়বে। সেই ভাবনা থেকে আন্দামানে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেলের সমন্বয়ে তৈরি করা হয় কালাপানি। সেল বা কোষ সদৃশ এই কাঠামোর জন্যই একে সেলুলার জেল বলা হয়।

Advertisement

 

এতো অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কয়েদীরা অনেক সময় আক্রমণ করে বসেছেন ইংরেজ সেপাইদের। এতে ইংরেজ সৈন্যদের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা যায়। আন্দামান সেলুলার জেলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মেয়াদে যেসব বিখ্যাত বিপ্লবী বন্দিজীবন যাপন করেছেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। দিওয়ান সিং কালেপানি, ফজলে হক খায়রাবাদী, যোগেন্দ্র শুক্লা, হেমচন্দ্র দাস, সাভারকর ভ্রাতৃদ্বয়, গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, লোকনাথ বল, উল্লাসকর দত্ত, মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, বটুকেশ্বর দত্ত, উল্লাসকর দত্ত প্রমুখ তাদের মধ্যে অন্যতম।

১৯০৮ সালের আলীপুর মামলায় গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বারীন্দ্রকুমার ঘোষের মতো কয়েকজনকে পাঠিয়ে দেয়া হয় আন্দামানে। উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চন্দ্র সিং, বাঘা যতীনের জীবিত সঙ্গী যতীশ চন্দ্র পাল প্রমুখকে পরবর্তীতে বাংলার বহরমপুর কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯২৪ সালে সেখানে যতীশ চন্দ্র পালের রহস্যময় মৃত্যু হয়। সাভারকর ভ্রাতৃদ্বয়, বাবারাও এবং বিনায়ক, দু’বছর ধরে জানতেই পারেননি যে তারা একই কারাগারের আলাদা কক্ষে আছেন।

কালাপানি : ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা এক কুখ্যাত বন্দিশিবির।

কালাপানির অভ্যন্তরীণ গ্যালারী; Source: theunspokenwords.net

জেলটি প্রথমবারের মতো আপামর জনতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ত্রিশের দশকের শুরুর দিকে। কয়েদীরা সবাই আমরণ অনশনের ঘোষণা দেন তখন। ব্রিটিশদের অমানবিক নির্যাতনের প্রতিবাদে মহাবীর সিং প্রথম অনশনের উদ্যোগ নেন। তাকে প্রতিহত করতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জোর করে দুধ খাইয়ে অনশন ভাঙার চেষ্টা করে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দুধ সরাসরি তার শ্বাসযন্ত্রে ঢুকে যায়। সাথে সাথেই মারা যান তিনি। তার মৃতদেহ ছুঁড়ে ফেলা হয় বঙ্গোপসাগরে। ১৯৩৭-৩৮ সালের দিকে মহাত্মা গান্ধী এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যস্থতায় মুক্তিকামী কয়েদীদের স্থানান্তরিত করার উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ সরকার।

১৯৪২ সালে জাপান সরকার আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ থেকে বিতাড়িত করে ব্রিটিশদের। সে সময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তার ‘আজাদ হিন্দু ফৌজ’ নিয়ে ১৯৪৩ সালের ৭ নভেম্বর এ দ্বীপটিকে দখল করে স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন। তিনি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নাম দেন শহীদ ও স্বরাজ দ্বীপপুঞ্জ। অবশ্য এ ঘটনার দু’বছর পর অর্থাৎ ১৯৪৫ সালে বৃটিশ সরকার এ দ্বীপমালা পুনরায় দখল করে নেয়। তবে ততদিনে ভারতে ইংরেজ শাসনের সূর্য অস্তমিত। তাই তারা আন্দামান সেলুলার জেলের সব বন্দিকে মুক্তি দিয়ে উপনিবেশটিও চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ততদিনে ইতিহাসের পাতায় এটি যে কালো অধ্যায় হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে, তা চিরকাল মানুষের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে।

Advertisement

 

সেলুলার জেলের বিল্ডিংটিতে সাতটি উইং ছিল, বাইসাইকেলের চাকার মতো সবগুলো উইং গিয়ে মিলিত হয়েছে একটি বিন্দুতে। তিনতলা উইংগুলোতে মোট সেলের সংখ্যা ছিল ৬৯৩টি। প্রতিটি সেলে মাত্র একজন করে কয়েদী থাকতো, কেউ কারো মুখ দেখবে এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সারাক্ষণ সেখানে প্রহরায় থাকতো অসংখ্য প্রহরী। জরুরী অবস্থার জন্য ছিল বিশালাকৃতির অ্যালার্ম।

কালাপানি : ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা এক কুখ্যাত বন্দিশিবির।

এখানে ফাঁসিতে ঝোলানো হতো রাজবন্দীদের; Source: ytimg.com

সেসব এখন অতীত। বিল্ডিংগুলো বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে, নিচের সংযোগ টাওয়ারসহ তিনটি উইং টিকে আছে কোনোমতে। ১৯৬৯ সালে বিল্ডিংটিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। বর্তমানে এটি ভারত ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের কাছে দর্শনীয় স্থান হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করেছে। এখানে বিভিন্ন গ্যালারিতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি এবং স্মারকচিহ্ন সংরক্ষিত আছে। শুরুতে যে সুশীলের কথা বলা হয়েছিল, তার পুত্র অনুপ বলেন,

“সে সময় আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে ভারত ভূখণ্ডের অংশ বলেই মনে করা হতো না। ওটা ছিল বিদেশ। রাজবন্দীদের আন্দামানে পাঠিয়ে তাদের মনোবল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়াই ছিল ব্রিটিশদের মূল উদ্দেশ্য।”

তারপরও মুক্তিকামী মানুষকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি ব্রিটিশরা। কোনো অপশক্তি পারেনি তাদের রুখতে। সেজন্যই স্বাধীন হতে পেরেছে ভারত, কালক্রমে স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশ।

2 years ago (10:29 pm)

About Author (72)

Administrator

This author may not interusted to share anything with others

Leave a Reply:

Related Posts

HTML hit counter - Quick-counter.net
About Us Advertise Contact Us
User Rights Terms Of Use Privacy Policy
F.A.Q. Copyright