শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!

ছবি আঁকার সময় ক্যানভাসের উপর শিল্পী রঙ-তুলির আঁচড়ে শুধু তার মনের যত ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, বাসনা, চিন্তা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। কখনো হয়তো তাতে থাকে গভীর কোনো সামাজিক সমস্যার উপস্থাপনও। একজন শিল্পী কিন্তু ছবি আঁকার সময় ভাবেন না যে, শত বছর পরে এর দাম কত হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীন এবং তার কাছাকাছি উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনবান শিল্পপ্রেমীরা বিশ্বের বিখ্যাত কিছু চিত্রকর্মকে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে কিনে নিয়ে শিল্পের ইতিহাসেই গড়ে তুলেছেন অনন্য এক রেকর্ড।

২০১৫ সালের ১১ মে, সোমবারের রাতে নিউ ইয়র্কে বিশাল বড় এক নিলামে পাবলো পিকাসোর মাস্টারপিস ‘লা ফেমেস ডি’অল্গার’ বিক্রি হয় প্রায় ১৭৯ মিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশি টাকার হিসাবে সংখ্যাটা দাঁড়াবে প্রায় ১,৪৫১ কোটি টাকা। নিলামে বিক্রি হওয়া আগের সব চিত্রকর্মের রেকর্ড ভেঙে দেয় এটি। তারপরও কিন্তু এত হইচই ফেলে দেয়া এই ছবিটি বিশ্বের সবচেয়ে দামি চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে চতুর্থ স্থান অর্জন করতে পেরেছে। প্রথমটির দাম এর চেয়ে ঢের বেশি। তবে সেগুলো কোনো নিলামে বিক্রি হয়নি। ব্যক্তিগত চাহিদায় ঘুরেছে হাত থেকে হাতে। চিত্রকর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া কিছু ছবি নিয়েই সাজানো হয়েছে আমাদের আজকের আয়োজন।

 

গগাঁর আঁকা ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ‘হোয়েন উইল ইউ ম্যারি?’

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!
হোয়েন উইল ইউ ম্যারি?

পল গগাঁর আঁকা তাহিতিয়ান দুটি মেয়ের ছবি বিশ্বের সবচেয়ে দামি ছবির তালিকায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়ে ফেলেছে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেচুরে দেয়া এই ছবিটি সুইস এক চিত্র সংগ্রাহকের হাত ঘুরে কাতারের এক ধনবান শিল্পবোদ্ধার হাতে আসে। তার জন্য অবশ্য কাতারের সেই ভদ্রলোককে, যিনি একেবারেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, গুনতে হয়েছিল পুরোপুরি ৩০০ মিলিয়ন ডলার বা ২,৪২৮ কোটি টাকা!

গগাঁ যখন প্রথমবার তাহিতি যান, তখনই এই ছবিটি এঁকে ফেলেন তিনি। ইউরোপের ‘কৃত্রিম এবং গতানুগতিক সবকিছু’ থেকে একপ্রকার পালিয়ে বাঁচতে তাহিতি ভ্রমণের উদ্যোগ নেন তিনি। ১৯৮২ সালে আঁকা এই তৈলচিত্রটি দীর্ঘদিন যাবত রুডলফ স্ট্যাকলিনের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ছিল।

 

পল সিজানের ২৭৪ মিলিয়ন ডলারের ‘দ্য কার্ড প্লেয়ার্স’

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!
দ্য কার্ড প্লেয়ার্স।

কাতারের রাজ পরিবারের বদৌলতে বিশ্বের দ্বিতীয় দামি ছবিটির মালিকানাও এখন তাদের দখলে। ২০১১ সালে ওয়েস্টার্ন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তারা কিনে নেয় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। এই একটি ছবির জন্যই খরচ হয়েছে প্রায় ২৭৪ মিলিয়ন ডলার বা ২,২১৮ কোটি টাকা। পল সিজানের এই ছবিটিতে পাথুরে মুখ করা দু’জন তাস খেলোয়াড়কে চিত্রায়িত করা হয়েছে। মডেল হিসেবে সিজান বেছে নেন তার পারিবারিক সাম্রাজ্যের রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত দুই ব্যক্তিকে। একজন ছিলেন তাদের বাগানের মালী, অপরজন কৃষক।

 

মার্ক রথকোর ১৮৬ মিলিয়ন ডলারের ‘ভায়োলেট, গ্রিন অ্যান্ড রেড’

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!
ভায়োলেট, গ্রিন অ্যান্ড রেড।

রাশিয়ান বিলিয়নিয়ার দিমিত্রি রিবোল্ভ আমেরিকান শিল্পীদের আঁকা ছবির একটি রেকর্ড করে দিয়েছেন। বিলিয়ন ডলার যার ঘরে আছে, তিনি তো আরেকজনের জন্য রেকর্ড গড়তেই পারেন! প্রতিভাবান এবং একই সাথে ভাগ্যবান এই আমেরিকান চিত্রশিল্পীর নাম মার্ক রথকো। সাদামাটা ক্যানভাসের উপর বেগুনি, সবুজ আর লাল রঙের আঁচড়ে আঁকা এই ছবিটির দাম ১৮৬ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি হিসাব মতে ১,৫০৫ কোটি টাকা প্রায়। যদিও ছবিটি কেনার পর জনাব দিমিত্রি রিবোল্ভ আর্ট ডিলার ভেস ব্যোভিয়রের নামে মামলা ঠুকে দিয়েছেন। তার মতে আর্ট ডিলার ছবিটির দাম নিয়ে রীতিমতো জোচ্চুরি করেছেন তার সাথে। তারপরও এই ছবিটি এখনো পর্যন্ত বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ মূল্যবান ছবি হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।

 

পিকাসোর ১৭৯.৩ মিলিয়ন ডলারের ‘লা ফেমেস ডি’অল্গার’

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!
লা ফেমেস ডি’অল্গার।

ফ্রেঞ্চ মাস্টার ইউগেন ডেলাক্রইক্সের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পাবলো পিকাসো ‘লা ফেমেস ডি’অল্গার’-এর ১৫টি ভিন্ন ভিন্ন রূপ এঁকে একটি সিরিজ বের করেন। ইউগেন ডেলাক্রইক্স ১৮৩৪ সালে তার অ্যাপার্টমেন্টে দ্য উইমেন অফ অল্গিরস’ নামে একটি ছবি আঁকেন। এই ছবিটি পিকাসোর খুব পছন্দ হয়। শুরুতেই ‘লা ফেমেস ডি’অল্গার’ এর যে কপিটি ১৭৯.৩ মিলিয়ন ডলার বা ১,৪৫১ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে তা ছিল ১৫টি ছবির সিরিজের ০ ভার্সন। পুরো সিরিজের মধ্যে এই ছবিটিই সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছে।

 

জ্যাকসন পলকের ১৬৫.৪ মিলিয়ন ডলারের ‘১৯৪৮’

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!
১৯৪৮।

রহস্যের অবগুণ্ঠনে আবৃত এক কেনাবেচায় ২০০৬ সালে নীরবে হাতবদল হয়ে যায় জ্যাকসন পলকের এই ছবিটি। ৮ ফুট বাই ৪ ফুট মাপের একটি ফাইবার বোর্ডের উপর আঁকা এই ছবিটির মালিক ডেভিড মার্টিনেজ বলে জানা যায়। বাদামি আর হলুদ রঙের ছিটে দেয়া এই ছবিটি ডেভিড গিফেনের জিম্মা থেকে ড্রিমওয়ার্কসের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা, বিজনেস ম্যাগনেট খ্যাত এই ব্যক্তি কিনেছেন- এমনটাই রয়েছে কাগজে কলমে। তবে মার্টিনেজের ল ফার্ম থেকে পরবর্তীতে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ডেভিড মার্টিনেজের সাথে এই ছবির কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে ছবিটির এই উচ্চ মূল্য কোত্থেকে আসলো আর কেনইবা তা নিয়ে এত আলোচনা এসব ঘিরে এখনো চলছে লুকোচুরি খেলা।

 

উইলিয়াম ডি কুনিংয়ের ১৬২.৪ মিলিয়ন ডলারের ‘উইমেন ৩’

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!
উইমেন ৩।

২০০৬ সালে ডেভিড গিফেন আরেকটি পেইন্টিং বিক্রি করেন। এটি কিনেছিলেন স্টিভেন কোহেন, হেজ ফান্ডের বিলিয়নিয়ার তিনি। কুনিংয়ের আঁকা ছয়টি ছবির একটি সিরিজের মধ্যে এটি ছিল তৃতীয়। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যে বিমূর্ত চিত্রের এক্সপ্রেশন নিয়ে কাজ করা শিল্পীদের মধ্যে তিনি ছিলেন নামকরা। তেহরানের সমসাময়িক শিল্প সংগ্রহশালার একটি অনবদ্য অংশ ছিল এটি। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর নারীদের নিয়ে কোনো ছবি আঁকা যাবে না এমন নিয়ম জারি করা হয় তেহরান সরকারের পক্ষ থেকে। আর তারপরই জাদুঘর থেকে সরিয়ে ফেলা হয় ‘উইমেন’ সিরিজের ছবিগুলো। পরবর্তীতে হাত থেকে হাতে ঘুরতে ঘুরতে তা এসে পড়ে ডেভিড গিফেনের হাতে। গিফেন তা ১৬২.৪ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১,৩১৪ কোটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেন স্টিভেন কোহেনের কাছে।

 

পাবলো পিকাসোর ১৫৮.৫ মিলিয়ন ডলারের ‘লা রিভ’

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!
লা রিভ।

২০১৩ সালে স্টিভেনে কোহেনের ছিনিয়ে নেয়া আরেকটি মহামূল্যবান ছবির নাম ‘লা রিভ’। এখানে স্টিভেন কোহেনের সম্পর্কে কিছু বলে নেয়া ভালো। ওয়াল স্ট্রিটের একজন বিশিষ্ট শিল্প সংগ্রাহক তিনি, পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছেন এসএসি ক্যাপিটাল। ২০০৬ সালেই ছবিটি সংক্রান্ত সব ডিল চূড়ান্ত হয়ে যায়। কিন্তু ঠিক সে সময়েই ঘটে আরেক বিপত্তি। ছবিটির প্রাক্তন মালিক স্টিভ উইন, ক্যাসিনো ম্যাগনেট নামেই যিনি বেশি পরিচিত, দুর্ঘটনাবশত ক্যানভাসের উপর কনুই দিয়ে চাপ দিয়ে বসেন। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসছিলো তার। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য ছবিটি মেরামত করিয়ে তারপর হাতবদল করেন স্টিভ। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫৮.৫ মিলিয়ন ডলার বা ১,২৮০ কোটি টাকায় বিক্রি হয় পিকাসোর এই ছবিটি।

 

গুস্তাভ ক্লিমতের ১৫৮.৪ মিলিয়ন ডলারের ‘অ্যাডেলে ব্লক বাউয়ার ১’

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!
অ্যাডেলে ব্লক বাউয়ার ১।

বিশ্ববরেণ্য কসমেটিকস ম্যাগনেট রোনাল্ড লডার স্বর্ণখচিত এই পোট্রেইটটি কেনেন ২০০৬ সালে। নিউ গ্যালারি নামের একটি চিত্রশালার জন্য ছবিটি সংগ্রহ করেন তিনি। সে সময় অবশ্য এই ছবিটি সবচেয়ে বেশি দামের জন্য রেকর্ড গড়েছিল। ছবিটির দাম ছিল ১৫৮.৪ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১,২৮২ কোটি টাকা। এই ছবিটির সাথে মিশে আছে অসাধারণ একটি গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি সৈন্যদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে দেশ ছেড়েছিলেন ছবিটির মালিকের একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী। ৮০ বছর বয়সে দেশে ফিরে এসে ছবির মালিকানা দাবি করে বসেন তিনি। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয়েছে একটি চলচ্চিত্র, যার নাম ‘উইমেন ইন গোল্ড’। সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন হেলেন মিরেন।

 

ভিনসেন্ট ভ্যান গগের ১৫২ মিলিয়ন ডলারের পোট্রেইট ‘ড. গাসেথ’

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!
ড. গাসেথ।

ভ্যান গগের জীবনের একদম শেষ কয়েক মাসে তার রোগ সারিয়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করা এক চিকিৎসকের নাম ডাক্তার গাসেথ। ১৯৯০ সালে ছবিটি যখন বিক্রি হয়, তখন তা ছবির জগতে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। ১৫২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১,২৩০ কোটি টাকায় বিক্রি হয় ছবিটি। টোকিওর এক আর্ট ডিলার জাপানের শিল্পপতি রায়োজ সাইতোর হয়ে ছবিটি কেনেন। সাইতো যখন দেনায় গলা পর্যন্ত ডুবে মৃত্যুবরণ করেন, তখনই হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক আর্ট মার্কেট থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে যায় ছবিটি। এখনো পর্যন্ত এর কোনো হদিস মেলেনি।

 

ফ্র্যান্সিস বেকনের ১৪৫ মিলিয়ন ডলারের ‘থ্রি স্টাডিস অফ লুসিয়ান ফ্রয়েড’

শত মিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়া শীর্ষ দশ চিত্রকর্ম!
থ্রি স্টাডিস অফ লুসিয়ান ফ্রয়েড।

২০১৩ সালে নিউ ইয়র্কে ক্রিস্টিতে রেকর্ড গড়ে ফ্র্যান্সিস বেকনের এই ছবিটি। নিলামে ছবিটির দাম হাঁকা হয় ৮৫ মিলিয়ন ডলার থেকে। সাতজন ক্রেতার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি দাম হাঁকানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৪৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১,১৭৩ কোটি টাকায় বিক্রি হয় ছবিটি। ১৯৬৯ সালে আঁকা ছবিটিতে ফ্র্যান্সিস বেকনের বন্ধু লুসিয়ান ফ্রয়েডকে চিত্রায়িত করা হয়। লুসিয়ান ফ্রয়েড ছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ চিত্রকর।

Be the first to comment

Leave a Reply